আমেরিকা , সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬ , ২ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
প্রধানমন্ত্রী ১৪ এপ্রিল উদ্বোধন করবেন ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি সংসদের মুলতবি অধিবেশন শুরু গণমাধ্যম ঠিক থাকলে রাষ্ট্রের তিন অঙ্গ সোজা পথে চলবে : ডা. শফিকুর রহমান ক্লিনটন টাউনশিপে পুলিশের ধাওয়া এড়াতে গিয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা, নিহত ২ ধর্মীয় নেতাদের সম্মানি প্রদান : প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করলেন পাইলট প্রকল্প মিশিগানে সিনাগগে হামলা, সদস্যরা ভয়কে জয় করে একত্রিত মিশিগানে সিনাগগে গাড়ি নিয়ে ঢুকে গুলি, বন্দুকযুদ্ধের পর হামলাকারীর আত্মহত্যা হামলায় আহত সিনাগগ প্রহরী: অভিজ্ঞ পুলিশ কর্মকর্তা দমকা হাওয়ার তাণ্ডব : ওয়ারেনে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে পড়ায় জরুরি সতর্কতা সিনাগগ হামলার পর গভর্নরের বার্তা : ইহুদিবিদ্বেষ সহ্য করা হবে না সিনাগগে ট্রাক হামলার সময় শ্রেণিকক্ষে ছিল ১০৩ শিশু মিশিগানের সিনাগগে হামলার মূল উদঘাটনের প্রতিশ্রুতি দিলেন  ট্রাম্প মিশিগানে ট্রাক নিয়ে সিনাগগে ঢুকে গুলি, বন্দুকধারী নিহত মেট্রো ডেট্রয়েটে উচ্চ বাতাসের সতর্কতা যুক্তরাষ্ট্রের দূষিত স্থানের তালিকায় অ্যান আরবারের সাবেক কারখানা ডেট্রয়েটের পশ্চিমাঞ্চলে গুলিতে এক ব্যক্তির মৃত্যু, তদন্তে পুলিশ পিকচার্ড রকস ভাঙচুরে চারজনকে জরিমানা ও পার্কে প্রবেশ নিষিদ্ধ রোমুলাসে ইভি চার্জিং হাব নির্মাণের পরিকল্পনা টেসলার ত্রয়োদশ সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন, ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল  আজ থেকেই প্রকৃত গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা  : সংসদে প্রধানমন্ত্রী

সিলেটি বিয়ের গীতে যৌতুক

  • আপলোড সময় : ১৯-০২-২০২৬ ০৩:৫১:১২ পূর্বাহ্ন
  • আপডেট সময় : ১৯-০২-২০২৬ ০৩:৫১:১২ পূর্বাহ্ন
সিলেটি বিয়ের গীতে যৌতুক
যে প্রথা সমাজদেহে দুষ্টু ক্ষতেরমত সুদীর্ঘকাল থেকে বিরাজমান এবং যা নিরাময়ের পরিবর্তে দিন দিন ভয়াবহ রূপ ধারণ করে সমাজ-মানসকে ক্ষতবিক্ষত করছে এবং এর করালগ্রাসে বহু নিরপরাধ অসহায় নারীর  জীবনরূপ সাজানো বাগান লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে।  নারীর স্বপ্ন, সাধ, আকাঙ্ক্ষা, আত্মসম্মান চিরতরে বিলীন হতে বসেছে সেই ভয়াল বিভীষিকার নাম যৌতুক। বর্তমানে তা নির্মোঘ নিয়তিরূপে নারী-সমাজে অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে। পূর্বে এ প্রথায় কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। কিন্তু বর্তমানে এ প্রথা কন্যাদায়গ্রস্ত অভিভাবকের জীবনে ভয়ঙ্কর দুর্যোগ এবং বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এবার আমরা সিলেটি বিয়ের গীতে যৌতুক- প্রসঙ্গ বিষয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করব।  

সামাজিক মর্যাদায় হীন অথচ ধনাঢ্য পরিবারের মেয়েকে উচুঁ পরিবারে বিয়ে দিতে অথবা প্রতিষ্ঠিত উপযুক্ত পাত্র হাতছাড়া না করার অভিপ্রায়ে যৌতুক একটা মহামোক্ষম টোপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে যৌতুকের বিনিময়ে অহরহ পাত্র ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে। সমাজের নিম্ন স্তর থেকে শুরু করে সর্বস্তরে এ বিষবৃক্ষের ডালপালা বিস্তৃত। এটা ভয়াবহ মহামারি হয়ে জনসমাজের ব্যাষ্টি ও সমষ্টি জীবনকে অসুস্থ করে তুলছে। এ অনিরাময়যোগ্য ব্যাধির কারণে আর্থ-সামাজিক, মানসিক ও নৈতিক অবক্ষয় ঘটে চলেছে। এর মত দীর্ঘজীবী কুপ্রথা সমাজে বিরল।

যৌতুক বাংলা শব্দ, এর প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘পণ’। কিন্তু পণ শব্দটি প্রতিজ্ঞা অর্থেই অধিক ব্যবহৃত। “আরবি ও ফারসী ভাষায় এর সমার্থক কোন শব্দ না থাকলেও ‘বায়েনাহ’ ও দাওহাহ আরবি শব্দ দ্বারা ব্যাপক অর্থে যৌতুক বা পণ বুঝানো হয়ে থাকে। ১

“বিবাহের সঙ্গে যুক্ত হলে অবশ্য পণ শব্দের মানে কখনও কন্যাপণ বা Bride-price, কখনও  বরপণ বা Dowry . হিন্দীভাষী অঞ্চলে যথা বিহার, উত্তরপ্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশে পণের প্রতিশব্দ ‘দহেজ’, উর্দুভাষীরা একে বলেন জহেজ, পাঞ্জাবে এটি দহেজ বা ‘দজ’... এবং বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য অসমীয়াদের মধ্যে পণপ্রথার প্রচলন নেই। অক্সফোর্ড ইংরেজি অভিধানেDowry শব্দের প্রাসঙ্গিক অর্থ হল, যে অর্থ বা সম্পদ স্ত্রী তার স্বামীর জন্য নিয়ে আসে বা পত্নীর সঙ্গে (বিবাহের সময়) যে ধন দিয়ে দেয়া হয়। স্বামী স্ত্রীকে বা স্ত্রীর জন্য যে উপহার দেন তাকেও Dowry. বলা হয়।”২

“সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে, প্রাচীনকালে যৌতুক বা উপহার দান প্রথা আদিম অর্থনীতির একটি বৈশিষ্ট্য ছিল। ... প্রাচীন রোম, গ্রীস, মধ্যযুগীয় ইউরোপসহ অনেক দেশেই যৌতুক দেয়ার রীতি প্রচলিত ছিল। তখন বিভিন্ন সমাজে দুটো গোষ্ঠীর মধ্যে সন্ধি কিংবা আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে প্রতিপত্তি বিস্তারের জন্য মেয়ের বিয়ে দেয়া হত। বিয়েতে কন্যা এবং অর্ধেক রাজত্ব দেয়ার ঘটনাও চালু ছিল। প্রাগৈতিহাসিক যুগে ভারতীয় সমাজে রত্নালংকার, দাস-দাসী, গরু,মহিষ, হাতি প্রভৃতি যৌতুক দেয়ার প্রথা ছিল”। ৩
"বিবাহে যৌতুকের আদান-প্রদান বৈদিক যুগ থেকেই লক্ষণীয়। ঋগবেদের ১০ম মণ্ডলে বলা হয়েছে, সূর্যকন্যা সূর্যার বিবাহে প্রচুর  যৌতুক প্রদান করা হয়েছিল। সূর্যার পতিগৃহে গমনকালে সেই যৌতুকসহ আগে আগে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। মঘা নক্ষত্রের উদয়কালে সেই যৌতুকের অঙ্গীভূত গাভীসমূহ অর্জনী তাড়িয়ে নিয়ে যায়। এই মণ্ডলেই- ৩৯সূত্রে কন্যাকে বসনে-ভূষণে সজ্জিত করে জামাতার হাতে অর্পণ করার উল্লেখ আছে।  মনুসংহিতায় যৌতুক প্রথার স্পষ্ট উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়।. .. মনু অবশ্য কন্যার বিবাহে পণ গ্রহণকে সম্পর্ণরূপে নিষিদ্ধ  করেছেন। শুধু নিষেধ নয়, বলেছেন, যে পিতা অপত্য বিক্রয় করে অর্থাৎ বিয়েতে পণ গ্রহণ করে সে এবং গোহত্যাকারী সমান পাপী। মনু আবার একথাও বলেছেন যে, বিয়েতে কেবল পিতাই কন্যাকে যৌতুক প্রদান করবে তা নয়, বরপক্ষেরও উচিত কন্যাকে উপহার প্রদান করা”।৪

এগুলো ছাড়াও বাৎসায়নের কামসূত্রে যৌতুক ও পণপ্রথার উল্লেখ আছে। “কিন্তু পবিত্র কুরআনে যৌতুক দানের কোন কথা আদৌ বলা হয়নি। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বিবাহের সময় স্বামী কর্তৃক শুধু স্ত্রীকে মোহরানা প্রদান করার নির্দেশ দিয়েছেন, বরকে কোন যৌতুক প্রদানের হুকুম করেননি। "৫

“সমাজের সবচেয়ে ক্ষুদ্র অথচ সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠান পরিবারের মূল যোগসূত্র বিয়ের অন্যতম ইসলামি শর্ত দেনমোহর। মূল আরবী শব্দ ‘মাহর’ যাকে হিব্রু ভাষায় ‘মোহর’ এবং সিরীয় ভাষায় মাহরা বলা হয়, এবং বাংলা শব্দার্থ হচ্ছে বিয়েতে কন্যার প্রাপ্ত যৌতুক। এর  অর্থ হচ্ছে বন্ধুত্ব, উপহার বা চুক্তির মাধ্যমে নয় বরং স্বেচ্ছাকৃত দান, যা স্ত্রীর নিজস্ব সম্পত্তি হিসাবে গণ্য।  মোহর প্রকৃতার্থে একটি আরবীয় সংস্কৃতি। পৌত্তলিক আরবে বিয়েতে দেনমোহরকে একটি অত্যাবশ্যক শর্ত হিসাবে বিবেচনা করা হত। এবং দেনমোহর পরিশোধের পরই শুধু যথার্থ রীতিসিদ্ধ সম্পর্ক স্থাপিত হত। মোহরবিহীন বিবাহ বন্ধনকে খুবই জঘন্য এবং অবৈধ সম্পর্ক বলে গণ্য করা হত। আরব্য রমণীরা একে মর্যাদা হানিকর বিবেচনা করত এবং ঘৃণার সাথে এমন বিয়ে প্রত্যাখ্যান করত।৬

মোহরবিহীন বিয়ে ইসলামে বৈধ নয়। “পবিত্র কুরআন স্ত্রীকে পণ্যসামগ্রী এবং দেনমোহরকে পণ্যের বিনিময়ে মূল্য হিসাবে গ্রহণ করেনি ; বরং একে স্ত্রীর জন্য উপহার এবং একটি ন্যায়সঙ্গত দাবি হিসাবে চিহ্নিত করেছে যা স্ত্রী প্রতি ক্ষেত্রেই আদায় করতে পারবে। ... প্রকৃতপক্ষে মোহর হল স্ত্রীর বিয়ের মর্যাদা স্বরূপ স্বামীর উপর ধর্ম তথা আইন আরোপিত একটি পবিত্র দায়িত্ব বা আমানত”। ৭
আমাদের বক্তব্য হল, ইসলামে কন্যাপক্ষ কর্তৃক বরকে কোন রূপ যৌতুক প্রদান করার কথা বলা হয়নি।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপ, বিস্ময়, ক্ষোভ এবং ঘৃণার বিষয় সিলেটে পাত্রপক্ষ কর্তৃক যৌতুক নেয়া অত্যন্ত অমানবিক এবং অতিআবশ্যক একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রথায় পরিণত হয়েছে। হাজারে দু’ একটা ব্যতিক্রমও মাঝে মধ্যে ঘটে। তখন আমরা চৈত্রের আকাশে জলভরা কাজলমেঘের স্নিগ্ধতায় বিমোহিত হই। তবে অধিকাংশ পাত্র যৌতুক স্বরূপ বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রী
মর্যাদা ও মূল্যের স্মারক বলে গণ্য করে পরম পরিতুষ্টি লাভ করে। অথচ বিষয়টা যে আত্মসম্মান, ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদা হানিকর, এ বিষয়ে পাত্রের কোন শুভবুদ্ধি জাগেনা। এ জন্যেই মোটর সাইকেল, গাড়ি, এমনকি বাড়ি পর্যন্ত যৌতুকের তালিকায় যুক্ত হতে দেখি।

আমাদের বক্তব্যের সমর্থন ও পরিপোষণে ‘সিলেট অঞ্চলের বিবাহ সংস্কৃতি’ প্রবন্ধে হাজেরা খানমের অনুধ্যান প্রণিধানযোগ্য “সিলেট অঞ্চলের বিয়েতে হাঁড়ি, পাতিল থেকে সুই, সুতা বোতাম পর্যন্ত দেয়া হয়ে থাকে। সিলেট অঞ্চলের বিয়েতে কন্যাপক্ষ মেয়েকে বিয়ে দেয়ার সময় সংসারের প্রয়োজনীয় সকল আসবাব তৈরি করে দিয়ে থাকে। ধারণা করা যায়, একসময় সিলেটে যৌতুক প্রথা হিসেবে এর প্রচলন হয়। তবে এখন আর তা যৌতুক হিসেবে নয় ; বরং একটা রেওয়াজ হিসেবেই কন্যাপক্ষের উপর বর্তায় ; আবার তা না দিলে অনেকসময় বৌ-কে শ্বশুরবাড়ির কথা শুনতে হয় যা অনেকটাই যৌতুক প্রথার অনুরূপ। সম্ভ্রান্ত পরিবারে বৌকে কথা শুনতে না হলেও কনেপক্ষের আসবাব না দেয়াটাকে সামর্থের অভাব ধরা হয় এবং তা একটা আর্থিক ব্যর্থতা হিসেবে ধরে নেয়া হয়। সিলেট অঞ্চলে মুসলমানী বিয়েতে এই আসবাব বলতে পিঁড়ি, জায়নমাজ থেকে শুরু করে বিছানা, ড্রেসিং টেবিল, সোফা, ফ্রিজ পর্যন্ত সবই বোঝায়। কুসংস্কার বশত ঝাড়ু আর পাটা দেয়া হয়না। এসবের পাশাপাশি বদনা, হাতা, খুন্তি, বেড়ি সহ সংসারের যাবতীয় তুচ্ছাতিতুচ্ছ জিনিসও বাদ যায়না।” ৮

এবার মূল প্রসঙ্গ। সমাজে যৌতুকের প্রচলন সুপ্রাচীন কালের। চর্যাপদে যৌতুক প্রসঙ্গ
‘ডোম্বী বিবাহিআ অহারিউ জাম
জউতুকে কিঅ আণুতু ধাম।’ ৯

যৌতুকের আগ্রাসী লোভে নীচু ঘরের মেয়েকে বিয়ে করে আত্মতৃপ্তি লাভের চিত্র চর্যাপদের সমাজে বিদ্যমান। লালসার ক্ষীণ স্রোতস্বতী আজ ঝড়ের সমুদ্র। এর নিতল তলে অহরহ তলিয়ে যাচ্ছে নারীর স্বপ্ন, সাধ, গৌরব, অধিকার, সম্মান। সিলেটের বিয়ের গীত এ জাতীয় বেদনবিধুর চিত্রে পরিকীর্ণ। ঘুমে বিভোর কনেকে ঘুম থেকে জাগিয়ে অসহিষ্ণু দামান যৌতুকের হিসাব আদায়ে তৎপর,

‘কতই ঘুম ঘুমাইনগ বিবি দুই নয়ন ভরিয়া
তুমারও বাবাজি কি ধনও দিলা দেও মোরে সমজাইয়া’।
কনে একে একে যৌতুকের ফিরিস্তি তুলেধরে ‘লেপও দিছইন তোষকও দিছইন সঙ্গে দিছইন বিছানা’।
এ তালিকায় আরো আছে ‘ডেগও দিছইন, ডেকচিও দিছইন।  বাবুর্চি দিলা সঙ্গে। '
  যৌতুক সামগ্রীর মধ্যে নানা তৈজসপত্র, গরু বাছুরের সাথে হাতি ঘোড়াও বাদ যায়নি।
‘দাদাজি পাইয়া তানরে হাত্তি দান করিলা । মাইজি পাইয়া তানরে ঘুরা দান করিলা।'

পুরুষ শাসিত সমাজে নারীর অবমূল্যায়ন যৌতুক প্রথার মূল উৎস। যৌতুকের পরিমাণের সঙ্গে পাত্রের যোাগ্যতার নিবিড় যোগসূত্র বিদ্যমান। অনেক কন্যার যোগ্যতার ঘাটতি পূরণের জন্য যৌতুক মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে কাজ করে। একদিকে সম্পদশালী কনেপক্ষ যেমন পাত্র ক্রয়ে প্রবৃত্ত হন, অন্যদিকে অর্থপ্রাপ্তিযোগ অত্যন্ত লোভনীয়  এবং আকর্ষণীয় থাকায় পাত্র পক্ষ উৎসাহী হয়। অথচ বিবাহ মূলত একটা আত্মিক সুদৃঢ় বন্ধন। এ কারণেই বহু দম্পত্তির মাঝে যে বন্ধন থাকে তা একান্তই প্রাণহীন, যান্ত্রিক। দুই ভুবনের দুই বাসিন্দা হয়ে তারা একই ছাদের নিচে জীবন উপভোগের অভিনয় করে চলেন। তাদের না থাকে কোনো সখ্য। না কোনো বন্ধুত্ব। পারষ্পরিক শ্রদ্ধাবোধ সেখানে 'সোনার পাথর বাটির মতই অলীক অধরা বিষয়।

পুরুষ প্রধান সমাজে কুসংস্কার, শিক্ষার অভাব, ধর্মীয় গোঁড়ামি, ইত্যাদি কারণে নারীর মার্যাদা পুরুষদের চেয়ে অনেক কম, এ কথা বলা বাহুল্য। মূলত যৌতুকের ক্ষতিকর প্রভাবে সমাজ বিপর্যস্ত। ধনীদের কাছে যৌতুক বিলাসিতা হলেও অভাবগ্রস্ত পরিবার কন্যার বিবাহ দিতে গিয়ে আজ সর্বস্বান্ত হচ্ছে। সামর্থ থাক বা না থাক যৌতুক দিতে হবে। যৌতুক নামক সর্বনাশা বিষাক্ত ব্যাধির নির্মম শিকার আজ সমাজের কন্যা দায়গ্রস্ত পিতা-মাতা আর অসহায় নারী সমাজ। যৌতুক ব্যাধির যূপকাষ্ঠে বলি হচ্ছে নারীর স্বপ্ন, সাধ, আকাঙ্ক্ষা, মূল্য এমনকি জীবন পর্যন্ত। জন্মই বুঝি এদের আজন্ম পাপ। এ থেকে পরিত্রাণের আশায় অনেকে আত্মহত্যার পথ পর্যন্ত বেছে নিতে বাধ্য হয়। গীতের পাত্রেরও চাহিদার অন্ত নেই।

পাত্রপক্ষকে সন্তুষ্ট করার সর্বাত্মক প্রয়াসে পাত্রীপক্ষের তৎপরতারও শেষ নেই ।
'পালং আলনা সব আনছি  লেপতোষক বাইন্ধা রাখছি,
          ‘আংটি, ঘড়ি সকল আনছি সিলেট শহর গিয়া।’

এই ‘সকল আনছির’ জন্যে হারাতে হয়েছে চাষের জমি, বাড়িঘর এমনকি লাঙ্ল-যোয়াল সহ হালের বলদ জোড়া পর্যন্ত ; এ হিসেব কে রাখে ? এরপরও কন্যার একটা নিকানো উঠান আর লাবণ্যোজ্জ্বল লাউ ডগার সবুজ স্বপ্নকোরকযে পাঁপড়ি মেলার সুযোগ পাবে এ কথাকি নিশ্চিত করে বলা যায় ?

হাতি ঘোড়া সহ এতোকিছু যারা যৌতুক হিসাবে দিয়েছে তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি অত্যন্ত মজবুত একথা বলাই বাহুল্য। কিন্তু কৃষি নির্ভর জনগোষ্ঠীর অধিকাংশের পক্ষে এ ভার পর্বত প্রমাণ। এ কারণেই পাত্রের চাহিদার নিপীড়নে বিক্ষত নারীমন আপন দুর্ভাগ্যকেই দায়ী মনে করে। মিষ্টি, মিঠাই,পাজামা, আচকান পালং, আলনা, ঘড়ি, সাইকেল কত কত যৌতুক সামগ্রী। এরপরও বালিকা বধূর আশংকার শেষ নেই। তার কপোত হৃদয়ের বিকম্পনে গীত বেদনানীল,
‘গাইবাছুর দিও চাউলের কলসি দিও
পিডা-চিড়া না দিলে গাইল খাইবায় শেষে।'

যৌতুকের যাঁতাকলে নারী সমাজ প্রতিনিয়ত নিষ্পোষিত, নির্যাতীত হচ্ছে। প্রতি পদে পদে তারা লাঞ্ছিত। অনাদর, অবহেলা, আর অবমূল্যায়নের পাশবিক জুলুম তারা মাথা পেতে নিতে বাধ্য হচ্ছে। মূল্যবোধ আজ চরম অবক্ষয়ের মুখে। আজ মানবিকতা ভূলুণ্ঠিত। তাই কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার বিদারিত চিত্তের হাহাকারে গীতাকাশ মেঘান্ধ- ‘নয়ালি দামান্দে মাংগইন নয়ালি মডুকনারে।
   কইন্যার বাপে শুইন্যা বলইন হায় আল্লা রসুলনারে
   আল্লাতালা ঝিয়াই দিয়া ঘটাইলা জঞ্জালনারে।’
পরিতাপের সাথে বলতে হয়, সমাজে নারীর অবস্থান নির্ণয়নে ‘জঞ্জাল’ শব্দই যথার্থ। সমাজ কর্তৃক নারী কতটুকু মূল্যায়িত, এ শব্দের মাধ্যমে তা অত্যন্ত আপত্তিকর, নগ্ন সর্বোপরি চিত্তবিদারক রূপে সংস্থাপিত।

বিয়ের দিন, তারিখ ঠিকঠাক। আজন্ম পরিচিত প্রিয়জন পরিপার্শ্ব ছেড়ে চলে যেতে হবে অজানা অচেনা দূরের দেশে। কনের মন এমনিতেই বিষাদ কাতর। এর সাথে সাথে আবার ব্যাত্যাতাড়িত বেতসলতার মত বধূ-মন বিকম্পিত। মনের আকাশে আশঙ্কার কালমেঘ। ঝড়ের পূর্বাভাস। যৌতুকের জন্যে যদি নিগৃহীত হতে হয় ? এ জন্যেই হৃদয়ভেদী হতাশ্বাসে ব্যাকুলিত ক্রন্দন, জিজ্ঞাসা-
‘কান্দইন কুকিল আলাপে কান্দইন কুকিল বিলাপে।
কান্দইন কুকিল চাচির গলা ধইরা।
আমি যে যাইতাম পরদেশি হইয়া অ চাচি, কি ধন  দিবায় সঙ্গে’?
চাচির সরল জবাব ...‘হাতের রুলি, পাওর মল। জেওর দিলাম সঙ্গে’।

কৃষি-নির্ভর সমাজে গৃহপালিত পশুর মধ্যে গরুর ভূমিকা ও স্থান অপরিমেয়। যৌতুক হিসেবে গরু দেয়া লোকসংস্কৃতির অঙ্গ। গীতে বিষয়টা লক্ষণীয়ভাবে দৃষ্ট হয়। পূর্বে এবিষয়ে আমরা অবগত হয়েছি। আবারও এ প্রসঙ্গ ‘গাইও দিলাম বাছুরও দিলাম রাখোয়াল দিলাম সঙ্গে। উপর্যুক্ত বিষয়াদি ছাড়াও আরো বহুবিধ দ্রব্যসামগ্রী সিলেট অঞ্চলে যৌতুক তালিকায় যুক্ত আছে।

শুরুতেই আমরা অবগত হয়েছি, ইসলামে যৌতুকের উল্লেখ নেই। “তবে বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে যে, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) সেচ্ছায় তাঁর কন্যা ফাতিমার বিবাহের সময় যে দ্রব্যসামগ্রী দিয়েছিলেন তাকে যৌতুক হিসেবে বিবেচনা করার আদৌ কোন সুযোগ নেই। বিবাহের সময় প্রদত্ত অর্থসম্পদ যৌতুক হিসাবে বিবেচনা করতে গেলে দুটি শর্ত পূরণ করা আবশ্যক। প্রথমত পাত্রপক্ষের দাবির প্রেক্ষিতে অর্থ বা সম্পত্তি প্রদান। এবং দ্বিতীয়ত বিবাহের অত্যাবশ্যকীয় শর্ত বা প্রতিদান হিসাবে তা প্রদান। যা হোক, দাবি করে যৌতুক নেয়ার কথা কুরআন সুন্নাহ বা ইসলামি পণ্ডিত দের লেখায় কোন উল্লেখ পাওয়া যায়না।” ১০

এখানে বলাযায়, শাস্ত্রেও সাহিত্যে কখনো কখনো জামাতাকে স্বেচ্ছায় উপঢৌকন ও প্রীতি উপহার দানের চিত্র প্রতিবিম্বিত হতে দেখা যায়। তা বরপণ বলে গণ্য হতে পারে না। কারণ এই প্রীতি-স্নিগ্ধ দানে কোনরূপ পূর্ব শর্ত বা জবরদস্তি থাকে না। এ জাতীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে সুব্রতা সেন বলেন, “বিবাহে জামাতাকে অর্থ ও অন্যান্য উপহার প্রদানের বিচ্ছিন্ন ঘটনা শাস্ত্রে ও সাহিত্যে পাওয়া যাচ্ছে, তার দু’একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। মহাভারতে আদিপর্বে সুভদ্রা হরণের পর অর্জুন ও সুভদ্রার বিবাহ হলে বরপক্ষকে প্রচুর ধন দেওয়া হয়েছিল।অর্জুনের পর অভিমন্যু উত্তরাকে বিবাহ করে বিরাট রাজার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণে ধনলাভ করেছিলেন। জৈনগ্রন্থ উত্তরাধ্যয়ন থেকে জানা যায়, বারাণসীর রাজা বিবাহে তাঁর জামাতাকে এক হাজার গ্রাম, একশত হাতি, প্রচুরধন, একলক্ষ পদাতিকও দশ হাজার ঘোড়া দিয়েছিলেন। ধম্মপদ অট্ঠকথায় দেখা যায়, বিশাখার পিতা বিবাহ উপলক্ষে কন্যাও জামাতাকে ব্যবহারের উপযোগী অজস্র উপহার দিয়েছিলেন।” ১১

আমাদের গীতের দ্রব্যসামগ্রী কিছুতেই এর অঙ্গীভূত হতে পারেনা। গীতে পাত্রপক্ষের লালসা অত্যন্ত উৎকটরূপে প্রকাশিত। গীতের যৌতুক প্রীতি উপহার নয়, ভয়াল বিভীষিকা। এর প্রকৃত চেহারা উন্মোচনে রবীন্দ্রনাথের দুটো গল্পের অবতারণা আমাদের বিবেচনায় প্রাসঙ্গিক বলেই গণ্য। যৌতুক প্রসঙ্গে এদুটো গল্প অনিবার্যভাবেই আমাদের লেখনীর সাথে সুর মেলায়। এর একটি হৈমন্তী ‘। হৈমন্তীর বয়স সতেরো। এই অতিরিক্ত বয়সটা ত্রুটি হলেও বরের বাপের আর দেরি সয়না। “কন্যার বাপ সবুর করিতে পারিতেন, কিন্তু বরের বাপ সবুর করিতে চাহিলেন না।... মেয়ের বয়স অবৈধ রকমে বাড়িয়া গিয়াছে বটে ; কিন্তু পণের টাকার আপেক্ষিক গুরুত্ব এখনো তাহার চেয়ে কিঞ্চিৎ উপরে আছে, সেই জন্যই তাড়া”। ১২ অবশেষে শিশিরের ‘ভোরবেলাটুকুর কথা’ কিভাবে সকাল বেলায় এসে চিরদিনের জন্য নীরব নিথর হয়ে গেল-তা অনেকেরই জানা।

দ্বিতীয় গল্প ‘দেনা পাওনা’ কবির সমাজ-ভাবনার গূঢ়তর রসব্যঞ্জিত। উপলব্ধির গভীরতায় অতলস্পর্শ এ গল্পের আবেদন কাঁদনঘন রসাল্পনায় আমাদের পরিপ্লুত করে। নিরুপমার বিবাহে, “বরপক্ষ হইতে দশ হাজার টাকা পণ
এবং বহুল দানসামগ্রী চাহিয়া বসিল। রামসুন্দর কিছুমাত্র বিবেচনা না করিয়া তাহাতেই সম্মত হইলেন; এমন পাত্র কোনোমতে হাতছাড়া করা যায়না”।১৩ কিন্তু হতদরিদ্র পিতা শতচেষ্টার বিনিময়েও এই পর্বতপ্রমাণ দায় থেকে পরিত্রাণের কোন উপায় খুঁজে পাননা। ওদিক নিরুর ওপর নির্যাতন চলতেই থাকে। আমাদেরও তা গোচরীভূত হয় “নিরুপমার পক্ষে তাহার শ্বশুরবাড়ি শরশয্যা হইয়া উঠিল”।১৪ নিরু এসময় সঙ্গোপনে নিজেকে মৃত্যু-সাধনায় উজাড় করে দেয়। তার জীবনের মূলমন্ত্র হয়ে উঠে ‘মরণরে তুহু মম শ্যাম সমান’। ১৫
একসময় এ সাধনায় নিরুর সিদ্ধিলাভ ঘটে। এবং ওর মৃত্যুর সাথে সাথে যৌতুক বা বরপণের কদর্য মূর্তিটি আপন স্বরূপে প্রকটিত হয়ে ওঠে। মা নতুন সম্বন্ধের কথা জানিয়ে নিরুর বরকে চিঠি লিখলেন, “এবারে বিশ হাজার টাকা পণ এবং হাতে হাতে আদায়”। ১৬
সমাজে এ চিঠি অভাবিত বা দুর্লক্ষ নয় একথা বলার আর অপেক্ষা রাখেনা।

আলোচনার উপান্তে এসে আমরা আবারও বলতে চাই, যৌতুকের বিষক্রিয়ায় সমাজ-দেহ আজো বিক্ষত রক্তাক্ত হচ্ছে। সভ্যতা আজ অনেক প্রাগ্রসর হলেও যৌতুক দেয়া-নেয়ার প্রাচীন অপপ্রথার প্রতিনিয়ত অনুবর্তন চলছে। এই জঘন্য অমানবিক সামাজিক অপরাধটি ক্রমে ক্রমে লালিত পালিত ও বর্ধিত হচ্ছে। জগদ্দল পাথর হয়ে সমাজের কন্ঠরোধ করে চলেছে।

এ কালব্যাধি নিরাময়ের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও এই নিন্দিত প্রথাটি সুতীক্ষ নখর নিয়ে সমাজ-দেহে সগৌরবে জীবিত আছে।
তথ্যসূত্র
১. ইসলামিক ফাউন্ডেশন  পত্রিকা,  ২০১০,পৃ১১৯।
২. সুব্রতা সেন, পণপ্রথা শাস্ত্রে ও সমাজে, ১৯৯৮,পৃ. ২৬।
৩. আব্দুল হক তালুকদার, সমাজকল্যাণ পরিচিতি, ২০০০,পৃ. ১০৮।
৪.  ইসলামিক, পূর্বোক্ত,  পৃ. ১২১।
৫. ইসলামিক, পূর্বোক্ত,পৃ. ১২২। 
৬. ইসলামিক, পূর্বোক্ত, পৃ. ১২৮।
৭. ইসলামিক, পূর্বোক্ত, পৃ. ১২৯।
৮. হাজেরা খানম, বিবাহ, পূর্বোক্ত, পৃ. ৯৫-৯৬।
৯. অতীন্দ্র মজুমদার, চর্যাপদ,১৯৯৯,পৃ. ৪০। 
১০. ইসলামিক, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৩২।
১১. সুব্রতা, পূর্বোক্ত, পৃ. ৭৪।
১২. রবীন্দ্রনাথ,  গল্পগুচ্ছ,৬৪৭। 
১৩. রবীন্দ্রনাথ, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৩
১৪. রবীন্দ্রনাথ, পূর্বোক্ত,  পৃ. ১৭।
১৫. রবীন্দ্রনাথ, সঞ্চয়িতা, ১৮
১৬. রবীন্দ্রনাথ, পূর্বোক্ত,  পৃ. ১৮ 

নিউজটি আপডেট করেছেন : Suprobhat Michigan

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
বাংলাদেশি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের উৎসব : মিশিগান ফেস্ট, ২৮ মার্চ

বাংলাদেশি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের উৎসব : মিশিগান ফেস্ট, ২৮ মার্চ